নিজস্ব প্রতিবেদক | নোয়াখালী
একসময় যার পরিচয় ছিল ‘ভুলুয়া’, আজ সেই জনপদই নোয়াখালী নামে পরিচিত। নদী-খাল, চর জাগা, নদীভাঙন, রাজশক্তির পরিবর্তন, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং প্রশাসনিক পুনর্গঠন—দীর্ঘ ইতিহাসের নানা বাঁক পেরিয়ে বর্তমান নোয়াখালীর পরিচয় গড়ে উঠেছে।
এই জনপদের ইতিহাস শুধু একটি জেলার ইতিহাস নয়; এটি নদী ও মানুষের লড়াই, হারিয়ে যাওয়া শহর এবং নতুন করে গড়ে ওঠা জনপদেরও ইতিহাস।
ভুলুয়া—নোয়াখালীর প্রাচীন পরিচয়
বর্তমান নোয়াখালী অঞ্চল প্রাচীন বাংলার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ঐতিহাসিক জনপদগুলোর সঙ্গে যুক্ত ছিল। মধ্যযুগে এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় ছিল ভুলুয়া।
ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, ত্রয়োদশ শতকের দিকে ভুলুয়া ত্রিপুরা রাজ্যের প্রভাবাধীন একটি অঞ্চল হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। পরবর্তী সময়ে সুলতানি ও মুঘল শাসনের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এ অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিচয়ও পরিবর্তিত হয়।
ভুলুয়ার সঙ্গে স্থানীয় রাজশক্তি, জমিদারি ও বিভিন্ন শাসকগোষ্ঠীর উত্থান-পতনের ইতিহাস জড়িয়ে আছে।
‘নোয়াখালী’ নামের পেছনে যে গল্প
নোয়াখালীর নামের সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে এ অঞ্চলের নদী ও খালের ইতিহাস।
ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, ডাকাতিয়া নদীর প্রবল বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত হলে পানি নিষ্কাশনের জন্য একটি নতুন খাল খনন করা হয়। স্থানীয়ভাবে সেই খাল পরিচিত হয় ‘নোয়া খাল’ নামে।
‘নোয়া’ অর্থ নতুন। সময়ের সঙ্গে ‘নোয়া খাল’ নাম থেকেই নোয়াখালী নামের প্রচলন হয়েছে বলে ঐতিহাসিকভাবে উল্লেখ করা হয়।
অর্থাৎ নোয়াখালীর নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে নদী ও পানির সঙ্গে এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘ লড়াইয়ের ইতিহাস।
মুঘল আমল ও উপকূলের অস্থির সময়
সুলতানি আমলের পর মুঘল শাসন প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে নোয়াখালী অঞ্চলেও মুঘল প্রশাসনের প্রভাব বিস্তার করে।
সপ্তদশ শতকে উপকূলীয় অঞ্চলে পর্তুগিজ ও অন্যান্য জলদস্যুদের তৎপরতা এ এলাকার মানুষের জীবন ও বাণিজ্যে নানা সংকট তৈরি করেছিল। মুঘল প্রশাসন পরবর্তীকালে উপকূলীয় অঞ্চলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করে।
ব্রিটিশ আমলে নোয়াখালীর প্রশাসনিক পরিচয়
ব্রিটিশ শাসনামলে নোয়াখালী অঞ্চলের প্রশাসনিক গুরুত্ব বাড়তে থাকে। উনিশ শতকে প্রশাসনিক পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে নোয়াখালী স্বতন্ত্র জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
ব্রিটিশবিরোধী বিভিন্ন আন্দোলনেও এ অঞ্চলের মানুষের অংশগ্রহণ ছিল। ওয়াহাবি আন্দোলন ও খিলাফত আন্দোলনের মতো রাজনৈতিক-সামাজিক আন্দোলনের প্রভাব নোয়াখালীতে পড়েছিল।
১৯৪৬: ইতিহাসের এক বেদনাদায়ক অধ্যায়
নোয়াখালীর ইতিহাসে ১৯৪৬ সাল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বেদনাদায়ক অধ্যায়।
সে সময় নোয়াখালী ও আশপাশের এলাকায় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি শান্ত করতে এবং মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনতে মহাত্মা গান্ধী নোয়াখালীতে আসেন।
তিনি গ্রামে গ্রামে গিয়ে মানুষের সঙ্গে কথা বলেন এবং শান্তি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা প্রচার করেন।
গান্ধীর নোয়াখালী সফর আজও এই অঞ্চলের ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে স্মরণ করা হয়।
নদীগর্ভে হারিয়ে গেল পুরোনো নোয়াখালী শহর
নোয়াখালীর ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনাগুলোর একটি হলো—পুরোনো জেলা শহরের নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়া।
মেঘনা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে পুরোনো নোয়াখালী শহর ধীরে ধীরে বিলীন হতে থাকে। একসময় প্রশাসনিক ভবনসহ শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোও নদীর গ্রাসে চলে যায়।
একটি জেলা শহর এভাবে নদীগর্ভে হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা নোয়াখালীর ইতিহাসকে অন্যরকম বৈশিষ্ট্য দিয়েছে।
মাইজদীতে গড়ে উঠল নতুন জেলা সদর
পুরোনো নোয়াখালী শহর নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার পর জেলা সদর বর্তমান মাইজদীতে স্থানান্তর করা হয়।
নতুন জায়গায় প্রশাসনিক অবকাঠামো ও জনবসতি গড়ে উঠতে থাকে। সময়ের সঙ্গে মাইজদীই হয়ে ওঠে নোয়াখালীর প্রশাসনিক ও নাগরিক জীবনের কেন্দ্র।
এ কারণেই নোয়াখালীর একটি বিশেষ পরিচয় রয়েছে—জেলার নাম নোয়াখালী হলেও জেলা সদরের নাম মাইজদী।
বৃহত্তর নোয়াখালী থেকে জন্ম নিল ফেনী ও লক্ষ্মীপুর
একসময় বৃহত্তর নোয়াখালীর প্রশাসনিক সীমানা বর্তমানের চেয়ে অনেক বিস্তৃত ছিল।
১৯৮৪ সালের প্রশাসনিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে বৃহত্তর নোয়াখালী থেকে নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর—তিনটি পৃথক জেলা গঠিত হয়।
অর্থাৎ আজকের ফেনী ও লক্ষ্মীপুর একসময় বৃহত্তর নোয়াখালীর প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ ছিল।
এর ফলে নোয়াখালীর প্রশাসনিক সীমানা বর্তমান রূপ লাভ করে।
ইতিহাস বদলেছে, নোয়াখালীর পরিচয় বদলায়নি
ভুলুয়া থেকে নোয়াখালী—এই দীর্ঘ পথচলায় বহুবার বদলেছে এ অঞ্চলের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিচয়। নদী কখনো নতুন চর ও জনপদ সৃষ্টি করেছে, আবার কখনো কেড়ে নিয়েছে মানুষের বসতি ও শহর।
পুরোনো নোয়াখালী শহর হারিয়ে গেছে নদীগর্ভে। কিন্তু হারিয়ে যায়নি সেই শহরের স্মৃতি।
আজকের মাইজদী, নোয়াখালীর বিভিন্ন উপজেলা, চরাঞ্চল ও জনপদের মধ্যেও বেঁচে আছে সেই দীর্ঘ ইতিহাসের ছাপ।
ভুলুয়ার ঐতিহ্য, ‘নোয়া খাল’-এর গল্প, নদীগর্ভে হারিয়ে যাওয়া পুরোনো শহর, গান্ধীর পদচারণা এবং বৃহত্তর নোয়াখালী থেকে ফেনী-লক্ষ্মীপুরের পৃথক হয়ে যাওয়া—সব মিলিয়ে নোয়াখালীর ইতিহাস যেন নদীর মতোই; যার গতিপথ বদলেছে বহুবার, কিন্তু যার অস্তিত্ব আজও প্রবহমান।
নোয়াখালী খবর এক্সপ্রেস
সত্যের সন্ধানে অবিচল
ইতিহাস জানুন,শিকড়কে চিনুন












Leave a Reply